সরকারি হিসাবেই ২৪ কোটি টাকা কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের পকেটে * অর্থ সংকট দেখিয়ে কর্মচারীদের মাসের পর মাস বেতন দেয়া হচ্ছে নারাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশনের (বিআরটিসি) প্রায় ৮শ’ বাস প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রী পরিবহন করছে। যাত্রীদের কাছ থেকে নগদে ভাড়াও আদায় করা হচ্ছে। তবুও লাভের মুখ দেখছে না সংস্থাটি। উল্টো অর্থ সংকট দেখিয়ে সংস্থার বিভিন্ন ডিপোর কর্মচারী ও গাড়ি চালকদের মাসের পর মাস বেতন দেয়া হচ্ছে না। টাকা না থাকায় প্রায় একশ’ বাস মেরামতের অভাবে ডিপোতে পড়ে আছে। অথচ সংস্থার নিজস্ব হিসাবেই ডিপো ম্যানেজার, চালক ও বাস ঠিকাদারদের হাতে রয়েছে অন্তত ২৪ কোটি টাকা। সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ওই টাকা জমা দেয়ার বিধান থাকলেও তা থোড়াই কেয়ার করছেন তারা। রহস্যজনক কারণে ওই টাকা আদায়ে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না বিআরটিসি কর্তৃপক্ষ। এ অনিয়মের খেসারত দিচ্ছেন যাত্রীরা। টাকার অভাবে বাসে ফ্যান লাগানোসহ সঠিক মেরামত না হওয়ায় কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনা ও একাধিক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
অভিযোগ রয়েছে, বিআরটিসির বাস ইজারা, পরিচালনা ও মেরামতের নামে ডিপোগুলোতে চলছে মোটা অংকের অবৈধ লেনদেন। ওই টাকার ভাগ সংস্থার প্রধান কার্যালয়ের কতিপয় কর্মকর্তার কাছেও পৌঁছে যায়। এর ফলে ডিপোগুলোতে দুর্নীতি অনেকটা ওপেন সিক্রেটে পরিণত হয়েছে। অর্থ লেনদেনে ‘আগে নিজস্ব, পরে রাজস্ব’ স্লোগান প্রচলিত রূপ নিয়েছে। অর্থাৎ বাস ইজারায় ডিপো ম্যানেজারদের ঘুষের টাকা (নিজস্ব) দেয়ার পর সংস্থার খাতে রাজস্ব জমা হয়।
এসব অনিয়মের বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান যুগান্তরকে বলেন, সংস্থার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাউকে টাকা দিতে হয় না। টাকা দেয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। তবে কেউ নাম ভাঙিয়ে টাকার লেনদেন করছে কিনা- তা জানি না।
প্রায় ২৪ কোটি টাকা আদায় না হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, টাকা আদায় একটি চলমান প্রক্রিয়া। অনেকের কাছে টাকা রয়েছে তা আদায়ে চেষ্টা করা হচ্ছে। আবার টাকার হিসাবেও কিছুটা গরমিল রয়েছে। কিছু বিল সমন্বয় করা হয়নি। কেউ কেউ ভালো পারফরম্যান্স দেখাতে টাকার অংকের ফলস রিপোর্ট দিয়েছে। পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
জানা গেছে, সংস্থার আর্থিক খাত ভেঙে পড়ার উপক্রম হলেও অন্তত ২৪ কোটি টাকা মাসের পর মাস নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ডিপো ম্যানেজার, চালক ও ঠিকাদাররা। গত বছরের আগস্ট থেকে এ বছরের জুলাই পর্যন্ত এক হিসাবে দেখা গেছে, সংস্থার ১৮টি ডিপোতে গাড়ি চললেও সেখান থেকে নির্ধারিত ভাড়া পাওয়া যায়নি (সংস্থার ভাষায় অজমার রাজস্ব)- এমন তথ্য দেখিয়ে ১৩ কোটি ৩৬ লাখ ৫৬ হাজার ১২৪ টাকা আটকে রেখেছেন ডিপো ম্যানেজাররা। এ প্রসঙ্গে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ডিপো ম্যানেজার বলেন, ঠিকাদাররা আমাদের টাকা দেননি। তাই আমরাও সংস্থাকে টাকা দিতে পারছি না।
আবার গাড়ির ভাড়া আদায় করা হলেও নানা অজুহাতে অন্তত ৮ কোটি ৮৭ লাখ ৮৩ হাজার ৬৩ টাকা সংস্থার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দেননি ১২টি ডিপো ম্যানেজার। সংস্থার ভাষায় এটিকে ‘ক্যাশ ইন হ্যান্ড’ বলা হয়। এছাড়া দীর্ঘমেয়াদে লিজ দেয়া গাড়ির ইজারাদারদের কাছে বকেয়া রয়েছে ১ কোটি ৬৬ লাখ ৫৮ হাজার ৫৪৪ টাকা।
নাম গোপন রাখার শর্তে সংস্থার একাধিক কর্মকর্তা জানান, ডিপোগুলোর দেয়া তথ্য অনুযায়ী টাকার এ অংক দাঁড়িয়েছে। সঠিকভাবে অডিট করা হলে অক্টোবর পর্যন্ত সংস্থার বকেয়া টাকার পরিমাণ আরও অনেক বেড়ে যাবে।
তারা জানান, প্রতিদিনের রাজস্ব পরবর্তী কর্মদিবসে জমা করার জন্য সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিয়ে সংশ্লিষ্টদের বারবার তাগাদা দেয়া হলেও টাকা আদায়ে কোনো অগ্রগতি হয়নি। রহস্যজনক কারণে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থাও নেয়া হয় না। এ সংক্রান্ত সংস্থার এক নথিতে বিপুল পরিমাণ এ টাকা আদায় না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, ‘ডিপো প্রধানরা অধিকাংশ অজমা রাজস্ব জমা করেননি এমনকি অজমা রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যে পিডিআর অ্যাক্ট, ১৯৯৩ মোতাবেক মামলাও করেননি। পুরো বিষয়টি কর্তৃপক্ষের আইনানুগ আদেশ অমান্যের শামিল বলে প্রতীয়মান। এতে একদিকে কর্পোরেশনের আর্থিক শৃংখলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, অন্যদিকে কর্তৃপক্ষের আইনানুগ আদেশ লংঘিত হয়েছে।’ তবে ওই ক্ষোভ ফাইলবন্দি হয়ে পড়ে আছে, টাকা আদায়ে কঠোর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা গেছে, টাকা আদায় না হওয়ার শীর্ষে থাকা ঢাকা ট্রাক ডিপোতে অজমা রাজস্বের পরিমাণ ২ কোটি ৬১ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৪ টাকা। এছাড়া বগুড়া বাস ডিপোতে ২ কোটি ৪৬ লাখ ৩০ হাজার ৬৫ টাকা, মিরপুর দ্বিতল বাস ডিপোতে ১ কোটি ৩১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৯৪ টাকা, মতিঝিল বাস ডিপোতে ১ কোটি ৪০ লাখ ৯৭ হাজার ১০০ টাকা ও সিলেট বাস ডিপোতে ১ কোটি ১২ লাখ ৪১ হাজার ৪২৫ টাকা।
অপরদিকে ক্যাশ ইন হ্যান্ড রয়েছে সর্বোচ্চ কুমিল্লা ডিপোতে, টাকার পরিমাণ ৩ কোটি ১ লাখ ৪ হাজার ৯৫৮ টাকা। এছাড়া মতিঝিল বাস ডিপোতে ১ কোটি ৩৮ লাখ ১৫ হাজার ১৮৪ টাকা ও চট্টগ্রাম বাস ডিপোতে ১ কোটি ১০ লাখ ৮৫ হাজার ৭০৫ টাকা। অন্য ডিপোগুলোতে টাকার পরিমাণ কোটি টাকার নিচে।
অভিযোগ রয়েছে, সংস্থার কেন্দ্রীয় কার্যালয় ও ডিপোর কিছু দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার যোগসাজশের কারণে এসব টাকা আদায় হচ্ছে না। মিরপুর দ্বিতল বাস ডিপোর একজন চালক জানান, আর্থিক সংকট দেখিয়ে চার মাস ধরে চালক ও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেয়া হচ্ছে না। একইভাবে আরও কয়েকটি ডিপোতেও মাসের পর মাস বেতন আটকে আছে। এতে নিু আয়ের এসব মানুষ মানবেতর জীবন-যাপন করছেন। আবার কেউ কেউ বাধ্য হয়ে দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন। সংস্থার একজন কর্মকর্তা জানান, তিন মাস ধরে ডিপোগুলো থেকে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে কোনো আয় জমা হয়নি। সংস্থার ভবন ভাড়ার টাকা দিয়ে কর্মকর্তাদের বেতনের সংস্থান করা হচ্ছে।
বাস ইজারা ও মেরামতের নামে অনিয়ম : সংস্থার এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চট্টগ্রাম বাস ডিপোতে ৪ হাজার ১৮৫ টাকার রং লাগানোর ব্যয় দেখানো হয়েছে ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা। ওই ডিপোর বিভিন্ন দুর্নীতির দায়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করা হয় প্রতিবেদনে। এরপর কয়েক মাস পার হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, প্রতিটি ডিপোতেই এক গাড়ির যন্ত্রাংশ অন্য গাড়িতে লাগিয়ে নতুন যন্ত্রাংশের বিল তুলে নেয়া, বাজারের প্রচলিত দরের অতিরিক্ত দামে টায়ার, ব্যাটারি কেনাসহ নানা ধরনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ঘটনা ঘটছে। সংস্থার ১৭টি ডিপোতে এ ধরনের অনিয়ম ধরা পড়েছে। ওইসব ঘটনায় গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি জুলাই পর্যন্ত সংশ্লিষ্টদের থেকে ৩ লাখ ৯১ হাজার ৩১৯ টাকা আদায় করা হয়েছে।
এই অনিয়মের বিষয়ে বিআরটিসির চেয়ারম্যান মো. মিজানুর রহমান বলেন, মেরামতের যন্ত্রের দাম মানভেদে বিভিন্ন হয়ে থাকে। কেউ ১ হাজার টাকা দরের যন্ত্র কিনে ৫ হাজার টাকা বিল করে থাকলে তা ধরা কঠিন। এরই মধ্যে তদন্ত করে বেশ কিছু অনিয়ম ধরা পড়ার পর অ্যাকশন নেয়া হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাস ইজারা নেয়া ও পরিচালনার ক্ষেত্রেও বড় অংকের টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। প্রতিটি ট্রিপে এক থেকে তিন হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে ডিপো ম্যানেজারদের বিরুদ্ধে। ঠিকাদারদের লাভ ও ঘুষের টাকা পুষিয়ে দিতে ফাঁকি দেয়া হয় রাজস্ব আদায়ে। যেমন- গাজীপুর চৌরাস্তা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত ৮৮ কিলোমিটার দূরত্বে ৭৫ আসনের দ্বিতল বাসের ভাড়া গড়ে রাউন্ড ট্রিপ ৪ হাজার ৭৫০ টাকা ধরা হয়েছে। যদিও ওই দূরত্বের প্রতিটি রাউন্ড ট্রিপে অন্তত ৮ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করেন ঠিকাদাররা। সূত্র: যুগান্তর
